রবিবার, ৩ জুন, ২০১২

ঝরা পলাশ


এই নিয়ে বারবার নতুন দিনের বাসনায়
বেঁধেছি অনেক বাসা মৃত্যুমুখী দিনের সীমায়।
এবার আবার সেই দিন !
সেই ঝরা পলাশের দিন !
তবুও মাটিতে জাগে মৃদুগন্ধ কামনার ভার
তাই নিয়ে হৃদয়ের অসহ্য প্রয়াস বার বার
বাসা বাঁধবার !
সেই বাসা ঝড়ে উড়ে যায়
সেই বাসা মাটিতে মিলায়
পৃথিবীর জনারণ্যে জনতার দুর্বিনীত পায়;
নির্লজ্জ হৃদয়ে তবু ছায়া ফেলে বাসনার সোনা
নতুন বাসার আশা তবু চিত্তে করে আনাগোনা
তার চেয়ে এই ভাল নয়
হে মোর হৃদয়?

যে পলাশ ঝরে গেছে আজ তার প্রতিটি পল্লব
শাণিত খড়গের মত হানে যদি বাসনার শব
অবিচ্ছিন্ন ইতিহাস ছিন্ন করে যদি নেয় ভার
ইস্পাত-কঠিন এক দিন রচনার-
সে কি ভালো নয়,
হে হৃদয়, হে মোর হৃদয়?

হে বাঁশরী অসি হও


হে বাঁশরী অসি হও তুমি!
কেন না দুর্গের দ্বারে হানা দিল হায়েনা নয়ন;
কেন না উদ্যত আজ শাণিত নখর বহু
            শিবিরের উলঙ্গ আকাশে-
অতএব হে বাঁশী
        অসি হও তুমি;
অসি হও এ মোর প্রার্থনা !

মুমূর্ষু মাটির বুকে ভেঙেছে রাতের বহু নীড়,
লেলিহ তির্যক ফণা ছুঁয়েছে সহজ দিনগুলি;
শীতল চোখের পাশে
কালো  ডানা ছায়া ফেলিয়াছে;
অতএব হে বাঁশরী
        অসি হও অসি হও তুমি!

সুরের পেলব কুঁড়ি পেছনে উড়াও;
এবার দিনের চূড়া আকাশে ঘুরাও।
অরণ্য-স্বপন নয়
        এবার আরণ্য প্রতিরোধ;
নির্বিরোধ গুহাতলে
        অহিংসার গৌরব নিঃশেষ
বহুকাল-
এবার সূর্যের মুখোমুখি
স্বাক্ষরিত হোক তব সৈনাপত্য অঙ্গীকার-লিপি!
এবার প্রান্তর আর ধূলিম্লান পথ ডাকিতেছে,
এবার নীরব থাকা বাতায়নে বলয়বন্ধন;
এবার বন্যার মত আঁখিজল আনুক বিদ্রোহ।
আসন্ন মৃত্যুর মুখে অগ্নিময় ঝলসি উঠুক
বাঁচিবার পণ!

হে বাঁশরী অসি হও তুমি!
কেন না গৃহের দ্বারে অহিংস বৌদ্ধের তরবারি
মৃত্তিকার পিপাসায় জ্বলে!
(যদিও হাওয়ার দূত বহে আজো প্রীতি ও প্রত্যয়
ক'রো না প্রত্যয়,
পদ্মের ছলনাতলে জেগে আছে কেউটের কুণ্ডল!)
অতএব হে বাঁশরী অসি হও তুমি !
অসি হও এ মোর প্রার্থনা!

দিনগুলি মোর


দিনগুলি মোর বিকলপক্ষ পাখির মতো  
বন্ধ্যা মাটির ক্ষীণ বিন্দুতে ঘূর্ণ্যমান।                                                

আকাশে আজিও কামনার শিখা উজ্জ্বল কমনীয়।
জ্বলে দিগন্তে দীপ্ত দিবার দীপগুলি রমণীয়।
আমার নয়নে নেমেছে রাত্রি পঙ্গুতার
অন্ধকারের গুহাতে ব্যর্থ বাহুবিথার।

মনের ফাটলে স্মরণাশ্রিত স্বপ্নের কণাগুলি
জন্ম দিয়েছে লক্ষ বীজাণু কুটিল মৃত্যুদূত।
নীল অরণ্যে এল অপঘাত অকস্মাৎ
যুগের চিতায় জ্বলে জীবনের প্রিয় প্রভাত।
অন্ধ নয়নে দিনের কামনা আজিও ঊর্ধ্বায়িত
মনের অশ্ব  হ্রস্ব চরণ বঞ্চনা-বিক্ষত।

দিনগুলি আজ জরতী রাতের দুঃস্বপন,
চির দহনের তিক্ত শপথ করে বহন!
দিনগুলি মোর শ্বাপদ-বিজয়ী অরণ্যেতে
শর-খাওয়া এক হরিণ-শিশুর আর্তনাদ।

সে নেই

এখনো ভোরের রোদে সোনা ঝরে-
কুড়িয়ে নেবার
কিশোর ছেলেটি নেই।

শীতের সকালে
নিঃশেষ শিউলির ডাল,
বোশেখে বকুল
নাম ধরে ডাক দেয় ;
সাড়া নেই।
যার
নিজের খুশীতে রাত ভোর হতো
কাকভোরে তার
এখন ভাঙে না ঘুম।
সকালের সোনা
অকারণে ছুঁয়ে ছেনে সাগরজোয়ার
জাগাবার কেউ নেই,
কেউ নেই তাকিয়ে দেখার
চোখ মেলে।
এখনো ভোরের রোদে
দুটি কি তিনটি হরিয়াল
ঘুম ঝাড়ে শিরিষের ডালে,
সুর তোলে,
সে সুর শোনার কেউ নেই
জেগে নেই কিশোর ছেলেটি।
এখন ছেলেটি
সারাদিন ভয়ের ভাবনার
পথে হেঁটে ;
এখানে-ওখানে হাত পেতে
মিনতি জানায় :
গান নাও
সুর নাও
ফুল পাখি চাঁদ নাও
সমস্ত ভোরের সোনা এই নাও।
শুধু দাও-
একটু নির্ভর
আর
একটু ভরসা দাও মনে ;
একটু আশ্বাস দাও বেঁচে থাকবার
মাথা রাখবার ঠাঁই দাও।

সারাদিন পথে হেঁটে
সারাদিন মিনতি জানিয়ে
 শুধু তার মিনতির
প্রতিধ্বনি কুড়িয়ে কুড়িয়ে
দিন গেলে ;
কখন পথের পাশে ঘুমায় ছেলেটি।
পাশে তার
‘তিরিশ বৎসর কাল’
ক্লান্ত হয়ে ঘুমায় এখন।
কিশোর-চোখের সেই দৃষ্টির লাবণি
অসহ্য ঘুমের স্রোতে
ভেসে যায়। পৃথিবী যদিও
        চিরযৌবনা তবুও
সেই ভোরে
তাকিয়ে দেখার
          কেউ নেই
         জেগে নেই-
যদিও এখনো
ফুল ফোটে পাখি গায়
        আর
এখনো ভোরের রোদে সোনা ঝরে;
ঝরেছে যেমন
হাজার বছর ধ'রে পৃথিবীতে।

আমি কোন আগন্তুক নই : আহসান হাবীব

আসমানের তারা সাক্ষী
           সাক্ষী এই জমিনের ফুল, এই
নিশিরাইত বাঁশবাগান বিস্তর জোনাকি সাক্ষী
সাক্ষী এই জারুল জামরুল, সাক্ষী
পুবের পুকুর, তার ঝাঁকড়া ডুমুরের ডালে স্থিরদৃষ্টি
মাছরাঙা আমাকে চেনে
            আমি কোন অভ্যাগত নই
খোদার কসম আমি কোন ভিনদেশী পথিক নই
আমি কোন আগন্তুক নই।
আমি কোন আগন্তুক নই, আমি
ছিলাম এখানে, আমি স্বাপ্নিক নিয়মে
এখানেই থাকি আর
          এখানে থাকার নাম সর্বত্রই থাকা-
                        সারা দেশে। 

আমি কোন আগন্তুক নই। এই
খররৌদ্র জলজ বাতাস মেঘ ক্লান্ত বিকেলের
পাখিরা আমাকে চেনে
           তারা জানে আমি কোন অনাত্মীয় নই।
কার্তিকের ধানের মঞ্জরী সাক্ষী
           সাক্ষী তার চিরোল পাতার
টলমল শিশির, সাক্ষী জ্যোৎস্নার চাদরে ঢাকা         
              নিশিন্দার ছায়া
অকাল বার্ধক্যে নত কদম আলী
                তার ক্লান্ত চোখের আঁধার
আমি চিনি, আমি তার চির চেনা স্বজন একজন। আমি
জমিলার মা’র
শূন্য খা খা রান্নাঘর শুকনো থালা সব চিনি
               সে আমাকে চেনে।
হাত রাখো বৈঠায় লাঙলে, দেখো
আমার হাতের স্পর্শ লেগে আছে কেমন গভীর। দেখো
মাটিতে আমার গন্ধ, আমার শরীরে
             লেগে আছে এই স্নিগ্ধ মাটির সুবাস।
আমাকে বিশ্বাস করো, আমি কোন আগন্তুক নই।

দু’পাশে ধানের ক্ষেত
          সরু পথ
              সামনে ধু ধু নদীর কিনার
আমার অস্তিত্বে গাঁথা। আমি এই উধাও নদীর
               মুগ্ধ এক অবোধ বালক।